রক্তপ্রবাহের সময় ধমনির গায়ের চাপ

রক্তপ্রবাহের সময় ধমনি

হৃৎপিণ্ডের সংকোচন বা সিস্টোল। অবস্থায় ধমনির গায়ে রক্তচাপের মাত্রা সর্বাধিক থাকে। একে সিস্টোলিক চাপ (Systolic 

Pressure)। বলে। হৃৎপিণ্ডের (প্রকৃতপক্ষে নিলয়ের) প্রসারণ বা ডাইয়াস্টোল অবস্থায় রক্তচাপ সবচেয়ে কম থাকে। একে 

ডায়াস্টোলিক চাপ (Diastolic Pressure) বলে।

আদর্শ রক্তচাপ: চিকিৎসকদের মতে, পরিণত বয়সে একজন মানুষের আদর্শ রক্তচাপ (Blood pressure) সাধারণত 

120/80 মিলিমিটার মানের কাছাকাছি। রক্তচাপকে দুটি সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়। প্রথমটি উচ্চমান এবং দ্বিতীয়টি নিম্নমান। 

রক্তের উচ্চ চাপকে সিস্টোলিক (Systolic) চাপ বলে যার আদর্শ মান 120 মিলিমিটারের নিচে। নিম্নচাপকে ডায়াস্টোলিক 

(Diastolic) চাপ বলে। এই চাপটির আদর্শ মান মিলিমিটারের নিচে। এই চাপটি হৃৎপিণ্ডের দুটি বিটের মাঝামাঝি সময় 

রক্তনালিতে সৃষ্টি হয়। দুধরনের রক্তচাপের পার্থক্যকে ধমনিঘাত বা নাড়িঘাত চাপ (Pulse pressure) বলা হয়। সাধারণত 

সুস্থ উচ্চ রক্তচাপকে নীরব ঘাতক হিসেবে গণ্য করা হয়। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপাের্টে বলা হয়েছে 2020 সালের মধ্যে 

স্ট্রোক ও করােনরি ধমনির রােগ হবে বিশ্বের এক নম্বর মরণব্যাধি এবং দক্ষিণ | এশিয়ার দেশগুলােতে এর প্রকোপ ছড়িয়ে 

পড়বে মহামারী আকারে। হৃদ্‌রােগ এবং স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান কারণ হলাে উচ্চ রক্তচাপ।

উচ্চ রক্তচাপ কী? রক্ত চলাচলের সময় রক্তনালিগাত্রে যে চাপ সৃষ্টি হয়, তাকে রক্তচাপ বলে। আর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি 

রক্তচাপকে উচ্চ রক্তচাপ বলা হয়। এক

১ মানুষের ক্ষেত্রে সাধারণত সিস্টোলিক চাপ 120 মিলিমিটার পারদের নিচে এবং ডায়াস্টোলিক চাপ 80 মিলিমিটার পারদের 

নিচের মাত্রাকে কাক্ষিত মাত্রা হিসেবে ধরা হয়। আর এই রক্তচাপ যখন মাত্রাতিরিক্ত হয় তখনই আমরা তাকে উচ্চ রক্তচাপ 

বলে থাকি।

উচ্চ রক্তচাপ ঝুঁকির কারণ: বাবা বা মায়ের উচ্চ রক্তচাপ থাকলে তার সন্তানদের উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। 

এছাড়াও যারা স্নায়বিক চাপে (Tension) বেশি ভােগেন অথবা ধূমপানের অভ্যাস আছে, তাদের উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার 

আশঙ্কা দেখা দেয়। দেহের ওজন বেশি বেড়ে গেলে কিংবা লবণ এবং চর্বিযুক্ত খাদ্য বেশি খেলে এমনকি পরিবারের সদস্যদের 

ডায়াবেটিস বা কোলেস্টেরলের পূর্ব ইতিহাস থাকলে উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়। সন্তান প্রসবের সময় খিঁচুনি রােগের 

(Eclampsia) কারণে মায়ের রক্তচাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ: মাথাব্যথা, বিশেষ করে মাথার পেছন দিকে 

ব্যথা করা উচ্চ রক্তচাপের প্রাথমিক লক্ষণ। এছাড়া রােগীর মাথা ঘােরা, ঘাড় ব্যথা করা, বুক ধড়ফড় করা ও দুর্বল বােধ 

করাও উচ্চরক্তচাপের লক্ষণ। অনেক সময় রােগীর নাক দিয়ে রক্ত পড়ে। উচ্চ রক্তচাপের রােগীর ভালাে ঘুম হয় না এবং 

অল্প উচ্চ রক্তচাপের প্রতিকার: উচ্চ রক্তচাপের প্রতিকারে টাটকা ফল এবং শাক-সবজি খাওয়ার অভ্যাস করা উচিত। 

দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণে রেখে শারীরিক পরিশ্রম করা বা ব্যায়াম করা প্রয়ােজন। চর্বিজাতীয় খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকা 

ছাড়াও খাবারের সময় অতিরিক্ত লবণ (কাঁচা লবণ) খাওয়া উচিত নয়। ধূমপান ত্যাগ করা জরুরি। উচ্চ রক্তচাপ 

নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটতে পারে, যা স্ট্রোক নামে পরিচিত।

কর্মতৎপরতা, স্বাস্থ্য, বয়স এবং রােগের কারণে মানুষের রক্তচাপের মাত্রা কমবেশি হতে পারে। মােটা লােকদের ওজন কমানাে, 

চর্বিজাতীয় খাদ্য কম খাওয়া, খাবারে কম লবণ দেওয়া ইত্যাদি নিয়ম মেনে চললে উচ্চ রক্তচাপ এড়ানাে যায়। রক্তচাপ খুব 

বেশি হলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়িমিত ঔষধ। সেবন করা উচিত।

কোলেস্টেরল

কোলেস্টেরল হাইড্রোকার্বন কোলেস্টেইন (Cholestane) থেকে উৎপন্ন একটি যৌগ। উচ্চশ্রেণির প্রাণিজ কোষের এটি একটি 

গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কোলেস্টেরল লিপােপ্রােটিন নামক যৌগ সৃষ্টির মাধ্যমে রক্তে প্রবাহিত হয়। রক্তে তিন ধরনের লিপােপ্রােটিন 

দেখা যায়। (a) LDL (Low Density Lipoprotein): একে খারাপ কোলেস্টেরল বলা হয়, কারণ এটি হৃদ্‌রােগের ঝুঁকি 

বাড়ায়। সাধারণত আমাদের রক্তে 70% LDL থাকে। ব্যক্তিবিশেষে এই পরিমাপের পার্থক্য দেখা যায়।

রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা: দেহের অন্যান্য অঙ্গের মতাে হৃৎপিণ্ডে অক্সিজেন এবং খাদ্যসার

সরবরাহের প্রয়ােজন হয়। হৃৎপিণ্ডের করােনারি ধমনিগাত্রে চর্বি জমা হলে ধমনিতে স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহে বিঘ্ন ঘটে, ফলে হৃৎপিণ্ড 

পর্যাপ্ত অক্সিজেন এবং খাদ্যসার না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রক্ত চলাচল কমে যাওয়ার কারণে বুকে ব্যথা অনুভূত হয়। এ 

অবস্থাকে অ্যানজিনা (Angina) বলা হয়। এছাড়া ধমনির গায়ে বেশি চর্বি জমা হলে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় ফলে করােনারি 

হৃদরােগের আশঙ্কা অনেকগুণ বেড়ে যায়।

কোলেস্টেরলের কাজ: উপকারিতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কোলেস্টেরল কোষপ্রাচীর তৈরি এবং রক্ষার কাজ করে। প্রতিটি কোষের 

ভেদ্যতা নির্ণয় করে বিভিন্ন দ্রব্যাদি কোষে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে। মানবদেহের জনন হরমােন এনড্রোজেন ও

ইস্ট্রোজেন তৈরিতে সাহায্য করে। অ্যাডরেনাল গ্রন্থির হরমােন ও পিত্তরস তৈরিতে কোলেস্টেরলের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। 

কোলেস্টেরল পিত্ত তৈরি করে। সূর্যালােকের উপস্থিতিতে চামড়ার কোলেস্টেরল থেকে ভিটামিন ‘ডি’ তৈরি হয়, যা রক্তের 

মাধ্যমে কিডনিতে গিয়ে ভিটামিন ‘ডি’র কার্যকর রূপে পরিণত হয় এবং আবার রক্তে ফিরে আসে। কোলেস্টেরল মাত্রা দেহের 

চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনকে (এ, ডি, ই | এবং কে) বিপাকে সহায়তা করে। স্নায়ুকোষের কার্যকারিতার জন্য কোলেস্টেরল 

প্রয়ােজন। দেহের রােগ। প্রতিরােধ ব্যবস্থার সাথে কোলেস্টেরল ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

গবেষণায় প্রমাণিত যে রক্তে উচ্চমাত্রায় কোলেস্টেরল হৃৎপিণ্ড এবং রক্ত সংবহনের বিশৃঙ্খলার সাথে জড়িত। কোলেস্টেরল 

পিত্তরসের অন্যতম উপাদান হলেও একটি একটি বর্জ্য পদার্থ এবং যকৃতের মাধ্যমে দেহ থেকে অপসারিত হয়। পিত্তরসে 

কোলেস্টেরােলের মাত্রা বেড়ে গেলে তা তলানির মতাে। পিত্তথলিতে জমা হয়। কোলেস্টেরলের এ তলানিই শক্ত হয়ে 

পিত্তথলির পাথর (Gallbladder stone) নামে পরিচিত হয়। উল্লেখ্য, কোলেস্টেরল ছাড়াও পিত্ত, ফসফেট, ক্যালসিয়াম 

প্রভৃতি জমেও পিত্তথলির। পাথর হতে পারে।

অস্থিমজ্জা ও রক্তের অস্বাভাবিক অবস্থা: 

লিউকেমিয়া ভূণ অবস্থায় যকৃৎ এবং প্লীহায় লােহিত রক্ত কণিকা উৎপন্ন হয়। শিশুদের জন্মের পর থেকে লাল।

অস্থিমজ্জা হতে লােহিত কণিকা উৎপন্ন শুরু হয়। এগুলাে প্রধানত দেহে ০, সরবরাহের কাজ করে। যদি কোনাে কারণে 

অস্বাভাবিক শ্বেত কণিকার বৃদ্ধি ঘটে তাহলে রােগের লক্ষণগুলাে প্রকাশ পায়। তখন অস্থিমজ্জা অত্যধিক হারে শ্বেত 

রক্তকোষ উৎপাদন করার কারণে পরােক্ষভাবে লােহিত রক্ত অণুচক্রিকার উৎপাদন কমে যেতে পারে। লিউকেমিয়াকে রক্তের 

ক্যান্সার বলা হলেও এটি আসলে রক্ত উৎপাদন-ব্যবস্থার অস্বাভাবিকতাজনিত একটি রােগ এবং এতে প্রধানত যে অঙ্গটি 

ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় তা হলাে অস্থিমজ্জা। লােহিত রক্তকোষের অভাবে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়, যার ফলে রােগী দুর্বল বােধ 

করে, ফ্যাকাশে হয়ে যায় এবং শ্বাসকষ্ট হয়। অণুচক্রিকার অভাবে রক্ত জমাট বাঁধতে না পারার কারণে দাঁতের গােড়া ও 

নাকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক সময় কোনাে আঘাত ছাড়াই অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হয়। একই কারণে দেহ ত্বকে 

ছােট ছােট লাল বর্ণের দাগ দেখা দিতে পারে এবং পায়ের গিঁটে ব্যথা হয়ে ফুলে উঠতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শ্রেণিবিভাগ 

অনুসারে অর্ধশতাধিক প্রকারের লিউকেমিয়া আছে, যার বেশির ভাগেই শ্বেত রক্তকোষের আধিক্য দেখা যায়। কিন্তু অধিক 

হারে শ্বেত রক্তকোষ উৎপন্ন হলেও সেগুলাে আসলে ক্যান্সার কোষ এবং শ্বেতকোষের স্বাভাবিক কাজ, রােগ প্রতিরােধে 

অক্ষম। তাই লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই বিভিন্ন রােগজীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হন। রােগ প্রতিরােধ-ব্যবস্থার 

অস্বাভাবিকতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি জ্বর হতে পারে এবং লসিকা গ্রন্থি ফুলে যেতে পারে। এভাবে রক্তের তিন ধরনের কোষের 

প্রায় প্রতিটিরই স্বাভাবিক কাজ ঠিকমতাে না করতে পারা এ রােগের লক্ষণ। তবে লিউকেমিয়ার প্রকারভেদ অনুসারে লক্ষণের 

তারতম্য হতে পারে।

Post a Comment

أحدث أقدم