হৃৎপিণ্ডের গঠন ও কাজ

হৃৎপিণ্ডের গঠন ও কাজ

হৃৎপিণ্ডের গঠন হৃৎপিণ্ড বক্ষ গহ্বরের বাম দিকে দুই ফুসফুসের মাঝখানে অবস্থিত একটি ত্রিকোণাকার ফাঁপা অঙ্গ। এটি 

হৃৎপেশি নামক এক বিশেষ ধরনের অনৈচ্ছিক পেশি দিয়ে গঠিত। হৃৎপিণ্ড পেরিকার্ডিয়াম নামক পাতলা পর্দা দিয়ে আবৃত 

থাকে। হৃৎপিণ্ড-প্রাচীরে থাকে তিনটি স্তর, বহিঃস্তর বা এপিকার্ডিয়াম,

মধ্যস্তর বা মায়ােকার্ডিয়াম এবং অন্তঃস্তর বা এন্ডােকার্ডিয়াম। | বহিঃস্তর (Epicardium): এটি মূলত যােজক কলা নিয়ে 

গঠিত। এই স্তরটিতে বিক্ষিপ্তভাবে চর্বি থাকে এবং এটি আবরণী কলা দিয়ে আবৃত। মধ্যস্তর (Myocardium): এটি বহিঃস্তর 

এবং অন্তঃস্তরের মাঝখানে অবস্থান করে। দৃঢ় অনৈচ্ছিক পেশি দিয়ে এ স্তর গঠিত। অন্তঃস্তর (Endocardium): এটি 

সবচেয়ে ভিতরের স্তর। হৃৎপিণ্ডের প্রকোষ্ঠগুলাে অন্তঃস্তর দিয়ে আবৃত। এই স্তরটি হৃৎপিণ্ডের কপাটিকাগুলােকেও আবৃত করে 

রাখে। হৃৎপিণ্ডের ভিতরের স্তর ফাঁপা এবং চারটি প্রকোষ্ঠে বিভক্ত। উপরের প্রকোষ্ঠ দুটি নিচের দুটির চেয়ে আকারে ছােট। 

উপরের প্রকোষ্ঠ দুটিকে ডান এবং বাম অলিন্দ (right & left atrium) বলে এবং নিচের প্রকোষ্ঠ দুটিকে ডান এবং বাম 

নিলয় (right & left ventricle) বলে। অলিন্দ দুটির প্রাচীর তুলনামূলকভাবে পাতলা, আর নিলয়ের প্রাচীর পুরু অলিন্দ 

এবং নিলয় যথাক্রমে আন্তঃঅলিন্দ পর্দা এবং আন্তঃনিলয় পর্দা দিয়ে পরস্পর পৃথক থাকে। হৃৎপিণ্ডের উভয় অলিন্দ এবং 

নিলয়ের মাঝে | যে ছিদ্রপথ আছে, তা খােলা বা বন্ধ করার জন্য ভালভ (valve) বা কপাটিকা থাকে। ডান অলিন্দ এবং 

ডান নিলয়ের মধ্যবর্তী ছিদ্রপথ তিন পাল্লাবিশিষ্ট ট্রাইকাসপিড ভালভ দিয়ে সুরক্ষিত। একইভাবে বাম অলিন্দ এবং বাম 

নিলয় দুই পাশ্লাবিশিষ্ট বাইকাসপিড ভালভ (মাইট্রাল ভালভ নামেও পরিচিত) দিয়ে সুরক্ষিত থাকে। মহাধমনি ও ফুসফুসীয় 

ধমনির মুখে অর্ধচন্দ্রাকার কপাটিকা থাকে। এদের অবস্থানের ফলে পাম্প করা রক্ত একই দিকে চলে এবং এক ফোঁটা রক্তও 

উল্টো দিকে ফিরে আসতে পারে না।

হৃৎপিণ্ডের মধ্যে রক্ত সঞ্চালন পদ্ধতি 

যে হৃৎপিণ্ড একটি পাম্পের মতাে কাজ করে। হৃৎপিণ্ডের সংকোচন এবং প্রসারণ দিয়ে এ কাজ সম্পন্ন হয়। হৃৎপিণ্ডের অবিরাম 

সংকোচন এবং প্রসারণের মাধ্যমে সারা দেহে। রক্ত সংবহন পদ্ধতি অব্যাহত থাকে। হৃৎপিণ্ডের সংকোচনকে বলা হয় সিস্টোল 

এবং প্রসারণকে বলা। হয় ডায়াস্টোল। হৃৎপিণ্ডের একবার সিস্টোল-ডায়াস্টোলকে একত্রে হৃৎস্পন্দন (heart beat) বলে। 

অলিন্দ দুটি প্রসারিত হলে শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত হৃৎপিণ্ডে প্রবেশ করে। ঊর্ধ্ব মহাশিরার। ভিতর দিয়ে কার্বন 

ডাই-অক্সাইড যুক্ত রক্ত ডান অলিন্দে প্রবেশ করে। ফুসফুসীয় বা পালমােনারি শিরার ভিতর দিয়ে অক্সিজেন যুক্ত রক্ত বাম 

অলিন্দে প্রবেশ করে।

অলিন্দ দুটির সংকোচন হলে নিলয় দুটির পেশি প্রসারিত হয়। তখন ডান অলিন্দ-নিলয়ের ছিদ্রপথের। ট্রাইকাসপিড ভালভ 

খুলে যায় এবং ডান অলিন্দ থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড যুক্ত রক্ত ডান নিলয়ে প্রবেশ করে। ঠিক এই সময়ে বাম অলিন্দ এবং 

বাম নিলয়ের বাইকাসপিড ভালভ খুলে যায় তখন বাম অলিন্দ থেকে অক্সিজেন যুক্ত রক্ত বাম নিলয়ে প্রবেশ করে। এর 

পরপরই ছিদ্রগুলাে কপাটিকা দিয়ে বন্ধ হয়ে। যায়। এর ফলে নিলয় থেকে রক্ত আর অলিন্দে প্রবেশ করতে যখন নিলয় দুটি 

সংকুচিত হয়, তখন ডান নিলয় থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইডযুক্ত রক্ত ফুসফুসীয় ধমনির। মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে। 

এখানে রক্ত পরিশােধিত হয়। ঠিক একই সময়ে বাম নিলয় থেকে। অক্সিজেনযুক্ত রক্ত মহাধমনির মাধমে সারা দেহে পরিবাহিত 

হয় এবং উভয় ধমনির অর্ধচন্দ্রাকৃতির। কপটিকাগুলাে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে রক্ত পুনরায় নিয়ে ফিরে আসতে পারে না।

পর্যায়ক্রমিক সংকোচন এবং প্রসারণের ফলে রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। হৃৎপিণ্ডের কাজ: রক্ত সংবহন তন্ত্রের 

প্রধান অঙ্গ হৃৎপিণ্ড। এর সাহায্যেই সংবহনতন্ত্রের রক্তপ্রবাহ সচল থাকে। হৃৎপিণ্ডের প্রকোষ্ঠগুলাে সম্পূর্ণ বিভক্ত থাকায় 

এখানে অক্সিজেনযুক্ত ও অক্সিজেনবিহীন রক্তের সংমিশ্রণ ঘটে না।

রক্তবাহিকা

যেসব নালির ভিতর দিয়ে রক্ত প্রবাহিত বা সঞ্চালিত হয়, তাকে রক্তনালি বা রক্তবাহিকা বলে। এসব নালিপথে হৃৎপিণ্ড থেকে 

দেহের বিভিন্ন অংশে রক্ত বাহিত হয় এবং দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে পুনরায় হৃৎপিণ্ডে ফিরে আসে। গঠন, আকৃতি এবং 

কাজের ভিত্তিতে রক্তবাহিকা বা রক্তনালি তিন ধরনের ধমনি, শিরা এবং কৈশিক জালিকা।

(a) ধমনি (Artery) যেসব রক্তনালির মাধ্যমে সাধারণত অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত হৃৎপিণ্ড থেকে সারাদেহে বাহিত হয় তাকে 

ধমনি বলে। ফুসফুসীয় ধমনি এর ব্যতিক্রম। এই ব্যতিক্রমধর্মী ধমনি হৃৎপিন্ড থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইডযুক্ত রক্ত ফুসফুসে 

পৌঁছে দেয়।

(b) শিরা (vein) যেসব নালি দিয়ে রক্ত দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে হৃৎপিণ্ডে ফিরে আসে তাদের শিরা বলে। এরা ধমনির 

মতােই সারা দেহে ছড়িয়ে থাকে। শিরাগুলাে সাধারণত দেহের বিভিন্ন স্থানের কৈশিকনালি থেকে আরম্ভ হয় এবং এ রকম 

অসংখ্য নালি একত্রে সূক্ষ্ম শিরা, উপশিরা, অতঃপর শিরা এবং মহাশিরায় পরিণত হয়ে হৃৎপিণ্ডে ফিরে আসে। শিরার 

প্রাচীর ধমনির মতাে তিন স্তরবিশিষ্ট। শিরার প্রাচীর কম পুরু, কম স্থিতিস্থাপক ও কম পেশিময়। এদের নালিপথ একটু চওড়া 

এবং কপাটিকা থাকে। ফুসফুস থেকে হৃৎপিণ্ডে আসা শিরাটি ছাড়া অন্য সব শিরা কার্বন ডাই-অক্সাইডসমৃদ্ধ রক্ত পরিবহন 

করে হৃৎপিণ্ডে নিয়ে আসে। ফুসফুসীয় শিরা অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত ফুসফুস থেকে হৃৎপিন্ডে পৌঁছে দেয়।

c) কৈশিক জালিকা (capillaries) পেশিতন্তুতে চুলের মতাে অতি সূক্ষ্ম রক্তনালি দেখা যায়। একে কৈশিক জালিকা বা 

কৈশিক নালি বলে। এগুলাে একদিকে ক্ষুদ্রতম ধমনি এবং অন্যদিকে ক্ষুদ্রতম শিরার মধ্যে সংযােগ সাধন করে। ফলে ধমনি 

শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে ক্রমে ক্রমে সূক্ষ্ম হতে সূক্ষ্মতর কৈশিক নালিতে পরিণত হয় এবং প্রত্যেকটি কোষকে পরিবেষ্টন 

করে রাখে। এদের প্রাচীর অত্যন্ত পাতলা। এই পাতলা প্রাচীর ভেদ করে রক্তে | দ্রবীভূত সব বস্তু ব্যাপন প্রক্রিয়ায় কোষে 

প্রবেশ করে।

Post a Comment

أحدث أقدم